English
ঢাকা, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২৬-০৭-২৬ ২১:৪৯:৩১
আপডেটঃ ২০২৬-০৭-২৭ ০৪:৫৭:১১


শিক্ষা কি শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে?

শিক্ষা কি শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে?


সংস্কৃতি-সমন্বিত শিক্ষা রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা

শশাঙ্ক সাদী

সংস্কৃতি-সমন্বিত শিক্ষা কী?

শিক্ষা মানে কি শুধু তথ্য মুখস্থ করা আর পরীক্ষায় নম্বর তোলা? নাকি এর ভেতরে আরও কিছু আছেএমন কিছু যা একজন মানুষকে শুধু চাকরিযোগ্য নয়, বরং পূর্ণ মানুষ করে তোলে?

সংস্কৃতি-সমন্বিত শিক্ষা বা culture-inclusive education এই প্রশ্নেরই একটি উত্তর। এই ধারণার কেন্দ্রে আছে একটি সহজিয়া দর্শনশিক্ষা কখনও শূন্যে ঘটে না। প্রতিটি শিশু একটি নির্দিষ্ট ভাষা, ইতিহাস, লোকাচার শিল্পের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়। সেই সাংস্কৃতিক শিকড়কে শিক্ষার সাথে সংযুক্ত না করলে শেখার প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

সংস্কৃতি-সমন্বিত শিক্ষা মানে তাই শুধু পাঠ্যক্রমে লোকগান বা চিত্রকলা যোগ করা নয়। এর অর্থ হলো শিক্ষার্থীর নিজস্ব পরিচয়, ভাষা, স্থানীয় জ্ঞান সামাজিক বাস্তবতাকে শিখনের কেন্দ্রে রাখা। শিক্ষার্থী যখন তার নিজের জগতের সাথে পাঠের সম্পর্ক খুঁজে পায় তখনই সে সত্যিকার অর্থে শিখতে পারে। সেই শিক্ষা তার কাছে বোঝা নয়, আনন্দের পথ হয়ে ওঠে।

ইউনেস্কো গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট ২০২৫-এর  অ্যাডভোকেসি ব্রিফে দেখানো হয়েছে যে বিশ্বে এখনও ৪০ শতাংশ মানুষ তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা পায় না। নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই হার ৯০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা কেবল সাক্ষরতার ভিত্তি গড়ে তোলে না; তা গণিত বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার্থীর ফলাফলও উন্নত করে। আফ্রিকা পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে পরিচিত ভাষায় শিক্ষা লাভ করা শিশুরা বোধের সাথে পড়তে পারার ক্ষেত্রে অন‍্যদের চাইতে ৩০ শতাংশ বেশি সক্ষম। সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সাথে সংযুক্ত শিক্ষা শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশ, সৃজনশীলতা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এই তিনটিকেই শক্তিশালী করে আর বিশেষ করে প্রান্তিক শিশুদের ক্ষেত্রে  ঝরে পড়ার হার কমায়আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কৃতি-সমন্বয়ের অভাব

ঢাকার একটি সাধারণ সরকারি বিদ্যালয়ের কথা ভাবুন। সকাল সাতটায় ক্লাস শুরু। শিক্ষার্থীরা বেঞ্চে বসে আছে সারিবদ্ধ ভাবে, হাতে বই। শিক্ষক বোর্ডে লিখছেন, শিক্ষার্থীরা টুকে নিচ্ছে। দুপুরে ক্লাস শেষ, বিকেলে কোচিং, রাতে মুখস্থ করা। এই চক্রের কোথাও নেই গান, নেই গল্প বলার আসর, নেই নিজের এলাকার ইতিহাস জানার সুযোগ, নেই হাতে কিছু তৈরি করার আনন্দ।

বছরে একবার স্কুলে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান হয়। রবীন্দ্রজয়ন্তী বা নজরুলজয়ন্তীতে হয়তো একটি কবিতা আবৃত্তি, দুটো গান। কিন্তু এগুলো 'অনুষ্ঠান' মাত্রপাঠ্যক্রমের সজীব অংশ নয়, শিক্ষার ভেতরের স্পন্দনও নয়। সংস্কৃতি এখানে দৈনন্দিন জীবনযাপনের অংশ হয়নি, পরিণত হয়েছে বাৎসরিক আনুষ্ঠানিকতায়

বাংলাদেশের জাতীয় পাঠ্যক্রমে সাহিত্য শিল্পকলার জায়গা আছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো পরীক্ষার বিষয় হিসেবে উপস্থিত। অনুভবের মাধ্যম হিসেবে নয়। একজন শিক্ষার্থী রবীন্দ্রনাথের কবিতার ছন্দ বিশ্লেষণ করে, ভাব-সম্প্রসারণ লেখে। কিন্তু সেই কবিতা তার ভেতরে কোনো অনুভূতি জাগায় কি না বা সে কবিতাটিকে ভালোবাসে কি না সেটা পরীক্ষায় আসে না। তাই গুরুত্বও পায় না।

গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে সমস্যা আরও গভীর। হাওরের একটি স্কুলে পড়া শিশু পাঠ্যক্রমে তার চারপাশের জলজ জীবন, লোকগান, কৃষিজ্ঞান নিয়ে বোঝার সুযোগ পায় না। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশু বাংলায় পড়তে বাধ্য হয়, তার নিজের ভাষা সংস্কৃতির কোনো ছায়া সে কোন বইয়ে খুঁজে পায় না। এই বিচ্ছিন্নতা কেবল আবেগের ক্ষতি করে না, শেখার আগ্রহও নষ্ট করে।

শিক্ষাবিদদের মত

শিক্ষাগবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন যে প্রান্তিক শিশুদের জন্য মাতৃভাষা স্থানীয় সংস্কৃতিভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত না করলে বিদ্যালয় তাদের কাছে একটি বিচ্ছিন্ন, অর্থহীন জায়গা হয়ে পড়ে। শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার পেছনে শুধু দারিদ্র্য নয়, এই সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাও দায়ী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (IER) অধ্যাপকরা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন যে বাংলাদেশের পাঠ্যক্রম মূলত ঔপনিবেশিক কাঠামোর উত্তরাধিকার বহন করছেযেখানে জ্ঞান মানে বাইরে থেকে আনা তথ্য; শিক্ষার্থীর নিজস্ব সামাজিক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা নয়। এই কাঠামো না ভাঙলে শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

সংস্কৃতিগবেষকরা বারবার সতর্ক করেছেন যে বাংলার লোকসংস্কৃতি যেমন বাউল, ভাটিয়ালি, পালাগান, যাত্রা, শিক্ষার মূলধারা থেকে ক্রমশ সরে যাচ্ছে। এর ফলে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে যারা নিজের দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে প্রায় অজ্ঞ।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কৃতিবিচ্ছিন্নতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলো। দেশের শহরাঞ্চলে বিশেষত ঢাকায় মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত পরিবারের একটি বড় অংশ সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যমে পাঠায়। ভবিষ্যতের জন্য, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য। এই সিদ্ধান্তের যুক্তি আছে। কিন্তু এই বিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রম মূলত ব্রিটিশ বা আন্তর্জাতিক কারিকুলামনির্ভর, যেখানে বাংলা ভাষা, বাংলার ইতিহাস সংস্কৃতির উপস্থিতি সীমিত। এই শিশুরা শেক্সপিয়র পড়ে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীমউদ্দীন বা জীবনানন্দ পড়ে না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানে খুবই সংক্ষেপে। হাসন বা লালনের দর্শন সম্পর্কে জানে না। ফলে তৈরি হয়  একটি সুচিন্তিত বিভাজন। এই শিশুরা ইংরেজিতে দক্ষ হয়। কিন্তু নিজের দেশের সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ বা মমত্ববোধ তৈরি হওয়ার সুযোগ পায় না। পরিচয়ের এই শূন্যতা পরবর্তী জীবনে নানাভাবে প্রকাশ পায়। দেশের প্রতি উদাসীনতায়, সংস্কৃতিকে 'পশ্চাৎপদ' ভাবার প্রবণতায়।

আন্তর্জাতিক পরিসরে শিক্ষাতাত্ত্বিক পাওলো ফ্রেইরি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Pedagogy of the Oppressed- প্রচলিত শিক্ষাকে 'ব্যাংকিং এডুকেশন' বলে সমালোচনা করেছেন। সেখানে শিক্ষক শুধু তথ্য 'জমা' দেন শিশুর মাথায়। শিশু যেন এক নিষ্ক্রিয় গ্রহণকারী পাত্র মাত্র। তাঁর মতে সত্যিকার শিক্ষা হয় সংলাপে, শিক্ষার্থীর নিজের বাস্তবতা থেকে প্রশ্ন তুলতে শেখার মধ্যে। আরেক শিক্ষাতাত্ত্বিক জন ডেউই বলেছিলেন, শিক্ষা জীবনের প্রস্তুতি নয়, শিক্ষাই জীবন। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে —  যে শিক্ষাব্যবস্থা শিশুকে তার নিজের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে, সে শিক্ষা মূলত ব্যর্থ।

ফিনল্যান্ডের উদাহরণ এই আলোচনায় বারবার আসে। তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় শিল্প, সংগীত স্থানীয় সংস্কৃতি পাঠ্যক্রমের কেন্দ্রে। শিক্ষার্থীরা প্রকৃতির মধ্যে শেখে, হাত দিয়ে নানা জিনিষ তৈরি করে, গান গাইতে গাইতে ভাষা শেখে। পরীক্ষার চাপ কম। মূল্যায়ন চলমান সামগ্রিক। ফলাফল হচ্ছে বিশ্বমানের সৃজনশীল নাগরিক, মানসিকভাবে সুস্থ প্রজন্ম।

রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষা নিয়ে যা ভেবেছিলেন তার মূল দর্শন ছিলো যে শিক্ষা হবে জীবনের সাথে, প্রকৃতির সাথে, সংস্কৃতির সাথে অবিচ্ছিন্নভাবে সংযুক্ত।

নিজে প্রচলিত বিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে গভীর অস্বস্তি অনুভব করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। চার দেয়ালের মধ্যে মুখস্থের চাপে আনন্দহীন পরিবেশে শিশুকে বন্দী করে রাখার এই পদ্ধতিকে তিনি মানবিক বিকাশের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো বলে মনে করতেন। শিক্ষার উপনিবেশায়ন বোঝাতে শিক্ষার হেরফের প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন যে ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা শিশুকে তার মাটি, ভাষা সংস্কৃতি থেকে উপড়ে ফেলে। এই শিক্ষা শিশুর মনে নিজের দেশের প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা তৈরি করে এবং পরনির্ভরতাকে স্বাভাবিক করে তোলে।

১৯০১ সালে বোলপুরে শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করে তিনি তাঁর শিক্ষাদর্শনকে বাস্তবে রূপ দিতে চাইলেন। গাছের ছায়ায় খোলা আকাশের নিচে ক্লাস। সংগীত নৃত্যকলা পাঠ্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কৃষিকাজ হস্তশিল্প শেখার সুযোগ কোনো বিলাসিতা না। এগুলো ছিল একটি সুনির্দিষ্ট দার্শনিক অবস্থানের প্রকাশ। সে দর্শন বলে যে শিশু যখন হাত দিয়ে মাটি স্পর্শ করে, গান করে, ছবি আঁকে তখন সে শুধু দক্ষতা অর্জন করে না, সে নিজেকে খুঁজে পায়।

রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত আত্মশক্তির বিকাশ।আশ্রমের শিক্ষাপ্রবন্ধে তিনি বলেছেন যে শিক্ষার পরিবেশটাই একটি বার্তা বহন করে।  যে পরিবেশে সৌন্দর্য নেই, আনন্দ নেই, সেখানে শিশুর মন সংকুচিত হয়ে যায়।তোতাকাহিনীগল্পে তিনি রূপকভাবে দেখিয়েছিলেন নির্দয় শিক্ষার নিষ্ঠুরতার পরিণতি।  পাখিকে খাঁচায় পুরে ঠোঁটে পাতার পর পাতা ঠেসে দিয়ে 'শেখানো' হলো। কিন্তু তাতে করে পাখিটি একসময় মরে গেল। গল্পটি রূপক হলেও তার বার্তা আজও একই ভাবে প্রযোজ্য।

পরবর্তীতে শান্তিনিকেতনকে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ আরেকটি বার্তা দিয়েছিলেন য়ে  শিক্ষা কেবল জাতীয় নয়, বৈশ্বিক হবে। কিন্তু সেই বৈশ্বিকতার ভিত্তি হবে নিজের সংস্কৃতি পরিচয়ের শক্ত মাটিতে। বিশ্বের সাথে কথা বলতে হলে আগে নিজেকে জানতে হবেএটাই ছিল তাঁর শিক্ষা দর্শনের মূলসূত্র।

রবীন্দ্রনাথ কি এখনও প্রাসঙ্গিক?

রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতার প্রশ্নটি আজ কেবল সাহিত্যিক নয় সামাজিক। কারণ সংস্কৃতি-সমন্বিত শিক্ষার অভাবে আমাদের সমাজে যে ক্ষতি হচ্ছে তা ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। সংস্কৃতিহীন শিক্ষার মূল্য আমরা কীভাবে চুকাচ্ছি?

পরিচয়সংকট মাদ্রাসা শিক্ষার প্রশ্ন

আজকের তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ নিজের ভাষা সংস্কৃতিকে 'পিছিয়ে পড়া' মনে করে। ইংরেজি মাধ্যমে পড়া শিশু বাংলায় কথা বলতে সংকোচ বোধ করে। গ্রামের ছেলে শহরে এসে তার আঞ্চলিক ভাষা লুকিয়ে রাখে। এই লজ্জা কোথা থেকে আসে? সে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থায় বড় হচ্ছে যা তাকে বলেছে যে তোমার মাটির ভাষা, তোমার লোকগান, তোমার পূর্বপুরুষের জ্ঞান পাঠ্যক্রমে আসার যোগ্য নয়।

এই পরিচয়সংকটের একটি বিশেষ এবং জরুরি মাত্রা হলো মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা। বাংলাদেশে লক্ষাধিক শিশু কওমি আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। এই শিক্ষাব্যবস্থার নিজস্ব মূল্য ঐতিহ্য আছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়। এই ব্যবস্থায় শিশু ইসলামি জ্ঞান ধর্মীয় পরিচয় পাচ্ছে। কিন্তু বাংলার লোকসংস্কৃতি, ভাষার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা দেশের শিল্প-সাহিত্যের সাথে তার সংযোগ কতটুকু? মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমে শিল্পকলা সংগীতের কোনো স্থান নেই বললেই চলে।

একটি শিশু যখন কেবল একটিমাত্র পরিচয়ের ভেতরে বড় হয় এবং তার চারপাশের সংস্কৃতি, মানুষ বহুধা ইতিহাসের সাথে তার পরিচয় ঘটে না তখন সে একটি সংকীর্ণ জগতের বাসিন্দা হয়ে ওঠে। পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহমর্মিতা বৈচিত্র্যকে সম্মান করার যে শিক্ষা সংস্কৃতি-সমন্বিত পাঠ্যক্রম দিতে পারে তা থেকে সে বঞ্চিত থাকে। এই বিচ্ছিন্নতা ব্যক্তির জন্য যেমন ক্ষতিকর তেমনি সমাজের সংহতির জন্যও বিপজ্জনক।

সৃজনশীলতার সংকট

বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী পাস করে বেরিয়ে আসছে কিন্তু উদ্ভাবনী চিন্তার ঘাটতি প্রকট। চাকরির বাজারে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা সৃজনশীলতার অভাবের কথা নিয়োগকর্তারা বারবার বলছেন। এটা আকস্মিক নয়। যে শিক্ষাব্যবস্থায় শিশু সারাজীবন উত্তর মুখস্থ করে সে প্রশ্ন করতে শেখে না, নতুন পথ খুঁজতে শেখে না।

সাম্প্রদায়িক সামাজিক সংহতির ক্ষয়

সংস্কৃতি-সমন্বিত শিক্ষা শুধু ব্যক্তির বিকাশ ঘটায় না। একটি সমাজকে একসূত্রে বাঁধতেও সাহায্য করে। লোকগান, মেলা, উৎসব, গল্পের ঐতিহ্য ইত‍্যাদি  বিভিন্ন মানুষকে একটি ভাগ করা পরিচয়ের মধ্যে যুক্ত করে। যখন শিক্ষাব্যবস্থা এই সংস্কৃতিকে ধারণ করে না তখন সেই বন্ধন আলগা হতে থাকে। ফলে সামাজিক বিভাজন, অসহিষ্ণুতা ভিন্নতার প্রতি অবজ্ঞা বাড়ে।

সামাজিক রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা

এই সংকট কেবল শ্রেণিকক্ষের সমস্যা নয়। এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের প্রশ্নও। বাংলাদেশের সংবিধানে সংস্কৃতির বিকাশ সংরক্ষণকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু বাজেট বরাদ্দে শিক্ষায় সংস্কৃতির অংশ নগণ্য। শিল্পকলা সংগীতের শিক্ষকের পদ অনেক বিদ্যালয়েই নেই, থাকলেও সেগুলো অগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। পাঠ্যক্রম সংস্কারের আলোচনায় সংস্কৃতির প্রশ্নটি বারবার পিছিয়ে যায়। যেন এটি প্রয়োজনীয়তা নয়, বিলাসিতা।

সমাজেরও দায় আছে। পরিবার সন্তানকে গান শেখাতে পাঠায় না কারণ তাতে 'ক্যারিয়ার' হয় না। সুশীল সমাজ সংস্কৃতি সংগঠনগুলো শহরকেন্দ্রিক কর্মসূচির বাইরে খুব কম যায়। গণমাধ্যম সংস্কৃতিকে বিনোদনের খোপে আটকে রাখে, শিক্ষার সাথে তার সম্পর্কের কথা তেমন বলে না। ফলে তৈরি হয় একটি সামগ্রিক সাংস্কৃতিক উদাসীনতা। যার মধ্যে শিশুরা বড় হয়।

রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা তাই শুধু তাঁকে স্মরণ করায় নয়। বরং তাঁর প্রশ্নকে নতুন করে সামনে আনায়। পাঠ্যক্রম সংস্কারের আলোচনায় আজ অবকাঠামো, বৃত্তি ডিজিটাল শিক্ষার কথা আসে। এগুলো জরুরি সন্দেহ নেই। কিন্তু সংস্কৃতি পরিচয়ের প্রশ্নটি এই আলোচনায় অনুপস্থিত থাকে। আমরা শিক্ষার বাইরের খোলসটা বদলাচ্ছি মাত্র, ভেতরের প্রাণটা নয়। রাষ্ট্র যদি সত্যিই একটি সুস্থ, সৃজনশীল সংহত সমাজ চায় তাহলে সংস্কৃতি-সমন্বিত শিক্ষাকে বিলাসিতা নয় বরং বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। আর সমাজকেও বুঝতে হবে যে শিশু শুধু পরীক্ষায় পাস করলেই মানুষ হয় না। সে মানুষ হয় যখন সে তার নিজের শিকড় চিনতে পারে, অন্যের পার্থক্যকে সম্মান করতে পারে, এবং সৌন্দর্যের ভেতর দিয়ে পৃথিবীকে বুঝতে পারে।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের সেই পথের কথাই মনে করিয়ে দেন। বারবার।প্রতি প্রজন্মে।

সূত্র: UNESCO Global Education Monitoring Report Advocacy Brief, ২০২৫; UNESCO — Languages Matter: Global Guidance on Multilingual Education, ফেব্রুয়ারি ২০২৫


ক্যাটেগরিঃ জীবনধারা,


শশাঙ্ক সাদী

উন্নয়নকর্মী, কবি



আরো পড়ুন