
বজলুল করিম আকন্দ
একসময় সারাবিশ্বের সংবাদমাধ্যমে আপেক্ষিকতার তত্ত্ব এত বেশি গুরুত্ব পায় যে, আইনস্টাইন তখনকার সুপারস্টারদের চেয়েও বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৩১ সালে হলিউড সুপারস্টার চার্লি চ্যাপলিনের সিনেমা ‘সিটি লাইটস’-এর উদ্বোধনী শোতে অতিথি হয়ে গিয়েছিলেন আইনস্টাইন। তখন উপস্থিত দর্শকেরা চার্লিকে দেখে যতটা আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন তার চেয়েও বেশি আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন আইনস্টাইনকে দেখে। তখন আইনস্টাইন চার্লিকে বলেছিলেন, ‘সবাই আপনার ভূয়সী প্রসংশা করেন যদিও আপনি একটি কথাও বলেন না।’

উত্তরে চার্লি বলেছিলেন, ‘তা ঠিক, তবে আপনার খ্যাতি তার চেয়েও বেশি যদিও তারা আপনি যা বলেন তা
বোঝেন না।’
আইনস্টাইনের বিশ্বজুড়ে খ্যাতির পেছনে রয়েছে আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। এটির জনক আলবার্ট
আইনস্টাইন। স্থান-কাল এবং ভর ও শক্তির মিলনের ভীষণ সুন্দর এই দলিল গণিতের ভাষায় লেখা। একসময় এ তত্ত্ব খুব কমসংখ্যক লোকই বুঝতে পারতেন। ইদানীং সংবেদনশীল বেশ কিছু প্রযুক্তি উদ্ভাবনে এটি বোধগম্য হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে কোনো ভুল এখনো খুঁজে পাওয়া যায় নি।
১৮৭৯ সালের ১৪ মার্চ জার্মানির উলম শহরে এক ইহুদি পরিবারে আইনস্টাইনের জন্ম। প্রাচীনকাল থেকে উলম-এর বাসিন্দারা গণিতে প-িত ছিলেন বলে কথিত আছে। উলমে আইনস্টাইনের পূর্বপুরুষদের ‘ফিদারবেডস’- এর ব্যবসা ছিল। ওখানে তাঁদের ব্যবসা ভালো চলছিল না। তাই আইনস্টাইনের জন্মের এক বছর পরই তাঁর পিতা-মাতা মিউনিখে চলে আসেন। এখানে তাঁর পিতা হেরম্যান ও চাচা জ্যাকব গ্যাস ও বিদ্যুৎ সাপ্লাই-এর ব্যবসা শুরু করেন। এই ব্যবসার আয়ে তাঁদের সংসার চলত। হেরম্যান সাদাসিদে প্রকৃতির লোক ছিলেন। সম্ভবত এ কারণেই তিনি সফল ব্যবসায়ী হতে পারেননি। বাল্যকাল থেকেই হেরম্যানের গণিতের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিল। তাঁর সে ইচ্ছা পূরণ হয়নি। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর মতো সঙ্গতি ছিল না তাঁর পরিবারের। তবে তাঁর ছোট ভাই জ্যাকব ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হতে পেরেছিলেন। আইনস্টাইনের মা পলিন ছিলেন খুবই বিচক্ষণ ও দৃঢ় মনোবলের অধিকারিণী। তাঁর মা’র সঙ্গীতের প্রতি খুব ঝোঁক ছিল। তিনি ভালো পিয়ানোবাদক ছিলেন। এটিই সম্ভবত আইনস্টাইনের সঙ্গীতপ্রিয়তায় উৎসাহ যুগিয়েছে সবসময়।

শৈশবে কেমন ছিলেন আইনস্টাইন?
শৈশবে তিনি কথা বলতে শুরু করেন একটু দেরিতে। ছোট বোন মাজা ছিল তাঁর খেলার সাথী। সাত বছর বয়স পর্যন্ত বাড়িতেই পড়াশুনা করেন তিনি। টিউটরের মুখে আলবার্টের প্রশংসা শুনে মা পলিন আহ্লাদিত। কারণ, তাঁর ভয় ছিল, দেরিতে কথা বলেছে যে ছেলেটা, সে যেন বোবা না হয়। তাঁকে স্কুলে ভর্তি করার পর রিপোর্ট কার্ড দেখে মা রীতিমত বিমর্ষ। কারণ, তা মোটেও আশাব্যঞ্জক ছিল না। অন্যদের সঙ্গে একদম মেশে না, পড়া মুখস্থ বলতে পারে না, আর প্রশ্ন করলে অনেকক্ষণ পরে জবাব দেয়। প্রায়ই জবাব দেওয়ার আগে কী যেন বিড়বিড় করে। এর কারণ, পিটুনির ভয়। পড়া ভুল বললে বেতের বাড়ি খেতে হবে। তাই উত্তরটা বলার আগে বিড়বিড় করে আওড়ে নেওয়া। স্কুল-কলেজের রেজাল্ট যদি বিচার করা হয়, তা হলে প্রায় মাঝারি তাঁর রেকর্ড, যদিও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি এগিয়েছিলেন অনেক সতীর্থ বিজ্ঞানীর চেয়ে। হঠাৎ তাঁর বাপ-চাচার ব্যবসায় মন্দা দেখা দেয়। তাই তখন তাঁর পরিবার জার্মানি ছেড়ে ইতালির মিলান শহরে বসবাসের জন্য চলে আসেন। আলবার্ট তখন মিউনিখে লুটপোল্ড জিমনেসিয়াম স্কুলের শেষ বর্ষের ছাত্র, বার্ষিক পরীক্ষার জন্য তাঁকে আরও কিছুদিন মিউনিখে থাকতে হবে। কিন্তু মিউনিখের বিদ্যালয় তাঁর কিছুতেই ভালো লাগত না। সেখানকার বাঁধাধরা নিয়ম-কানুন তাঁর কাছে সামরিক বিদ্যালয়ের মতোই মনে হতো। তাই তিনি কিছুদিন পরেই মিলানে বাবা-মা’র সাথে মিলিত হলেন। লুটপোল্ড জিমনেসিয়াম স্কুলের কঠোর শাসনের হাত থেকে রেহাই পেয়ে তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস
ফেললেন। ইতালির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাঁকে মুগ্ধ করল। এই সুযোগে তিনি ইতালির নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ালেন।
কিছুদিন এইভাবে কাটানোর পর তিনি ঠিক করলেন, ভর্তি হবেন জুরিখ-এর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে। সেসময় কারিগরী শিক্ষার জন্য সুইজারল্যান্ডের ওই কলেজের খুব নাম। আইনস্টাইন ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলেন এবং ফেল