English
ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২১-০৯-১৬ ২১:১১:৪৩
আপডেটঃ ২০২৬-১০-২৩ ০৭:১০:৪৮


রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইন

রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইন


বজলুল করিম আকন্দ

পিতা ‘মহর্ষি’ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে কবি একবার বেড়াতে গিয়েছিলেন ডালহৌসির পাহাড়ে; সেখানে আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র দেখতে দেখতে বিশ্বের বিচিত্র রূপ অল্প বয়সেই তাঁর চেতনাকে নাড়া দিয়েছিল। বিজ্ঞান চেতনার চাপা উত্তেজনা ভাষা পেল বালক রবীন্দ্রনাথের জীবনের প্রথম প্রবন্ধে-বিষয়, তারামণ্ডলী ও মহাকাশ। শুরু হলো সাহিত্যের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানের এক বিচিত্র অভিজ্ঞান। এই দুই পথের পথিক কিন্তু বাঁধা বন্ধনহীন গ্রন্থিতে ও একই চেতনার জগতে। সাহিত্যের রসস্রোতে বিজ্ঞানের স্বচ্ছন্দ গতি, আর বিজ্ঞানের বিচিত্র রহস্য আবিষ্কারের অদম্য উৎসাহ তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে এক দুর্লভ প্রাণশক্তি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ গীতিকার। তাঁর সঙ্গীতে বাঙালি মনমানসের হাসি-কান্না, প্রেম-ভালোবাসা, দেশভক্তি, ঈশ্বরস্তুতি ও প্রকৃতি সবকিছু মূর্ত হয়ে উঠলেও তিনি সারাজীবন জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা বিষয়ের ওপর সমান নজর রেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মহাবিস্ময় শুধু ভাবুক কৌতূহলী হিসেবে নয়, তা সত্যিকারের বিস্ময়, ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,/ তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান,/ বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।’


 অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, যিনি আপেক্ষিকতা তত্ত্বের জনক, তিনি সঙ্গীত ও বিজ্ঞানে তেমন কোনো পার্থক্য খুঁজে পেতেন না। তিনি বলতেন, ‘ঈশ্বরের সৃষ্টজগতের মতোই সঙ্গীতও এক সুশৃঙ্খল ছন্দে আবদ্ধ।’ আইনস্টাইন বেহালায় মোজার্ট আর বিঠোফেনের সুর বাজাতেন এবং কোয়ান্টাম তত্ত্বের অন্যতম স্রষ্টা রিচার্ড ফাইনম্যান বাজাতেন বংগো।

 

রবীন্দ্রনাথ অল্প বয়সেই জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত হন। যেমন, মায়ের আসরে এক আলোচনায় তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি প্রক্টরের গ্রন্থ হইতে গ্রহ-তারা সম্বন্ধে অল্প যে একটু জ্ঞান লাভ করেছিলাম তাহাও ...বিবৃত করিতে লাগিলাম।’ (দৃষ্টান্তটি ‘জীবনস্মৃতি’ থেকে নেয়া হয়েছে)। প্রক্টর নামক যে বিজ্ঞানীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে তিনি হচ্ছেন ইংরেজ জ্যোতির্বিদ রিচার্ড অ্যানটনি প্রক্টর (১৮৩৭-১৮৮৮)। তিনি ‘হ্যান্ড বুক অফ দি স্টারস (১৮৬৬)’ গ্রন্থের প্রণেতা। মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ বাল্যকালে এই গ্রন্থখানাই পড়ে থাকবেন। প্রথম বয়সেই বিজ্ঞানের বিষয় থেকে বিস্ময়বোধ তাঁর পরবর্তীকালের বিজ্ঞানপ্রিয়তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এছাড়াও বাল্যকালেই সীতানাথ দত্তের মতো পণ্ডিত ব্যক্তির সাহচর্য ও তাঁর বিজ্ঞানের নানা জটিল বিষয় সহজ করে বোঝাবার কৌশল রবীন্দ্রনাথকে বিজ্ঞাননির্ভর হতে সচেষ্ট করেছিল।

 

রবীন্দ্রনাথ বিশ্বের অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন, ইংল্যান্ডে যান মাত্র সতেরো বছর বয়সে। জার্মানিতে যান দু’বার-১৯২৬ ও ১৯৩০ সালে। যে দু’বার আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর দেখা, সেখানে দুই নোবেলজয়ী বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে কথোপকথনে মেতে উঠেন। কথোপকথনের প্রতিপাদ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল কোয়ান্টাম তত্ত্ব। কোয়ান্টাম তত্ত্বের মূল সূত্রটি হলো- কোনো পদ্ধতির একটি মাত্র ইতিহাস থাকে না, এর থাকে অনেকগুলো সম্ভাব্য ইতিহাস। আইনস্টাইন কোয়ান্টাম তত্ত্বের এরূপ ব্যাখ্যা পুরোপুরি মেনে নিতে পারেননি কোনো দিন। যদিও রবীন্দ্রনাথ বস্তুবাদী কিংবা ভাববাদী কোনো দর্শনেই নিজেকে স্পষ্টভাবে যুক্ত করেননি কখনও, তবে তাঁর চিন্তা-চেতনা চিরায়ত বিজ্ঞানের ধ্যানধারণার চেয়ে কোয়ান্টাম তত্ত্বের ব্যাখ্যার অনুরূপ বলে মনে হয়- যখন তিনি বলেন, ‘আমারি চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ, / চুনি উঠল রাঙ্গা হয়ে।/ ----- গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম ‘সুন্দর’ - সুন্দর হল সে।’ কবি বলে উঠলেন, ‘ব্রহ্মা- যেন মাকড়সার জাল, মন হল মাকড়সা, কারণ মন যেমন একক, তেমনই বহু।’

 

দু’জন দুই পথের অনুসারী হয়েও একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিলেন। যেমন, ওই সাক্ষাতের পর সাংবাদিকরা রবীন্দ্রনাথকে প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি আইনস্টাইনকে কেমন দেখলেন, উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন: ‘আমার একজন কবির সাথে দেখা হলো।’ আর আইনস্টাইনকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেছিলেন: ‘আমি একজন বিজ্ঞানীর সাথে কথা বলেছি- কবির সাথে নয়।’ (তথ্যটি অমিয় চক্রবর্তী’র ‘সাম্প্রতিক’ গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে)।

 

বিজ্ঞানীরা বলেন, মহাবিশ্বে রয়েছে ভর ও শক্তির খেলা (ভর হলো বস্তুর মোট পরিমাণ)। মহাবিশ্বের তাবৎ বস্তু মাত্র কয়েকটি কণা আর কতগুলো বলের ক্রিয়ার উপহার। এজন্য রয়েছে দু’টি তত্ত্ব। কণাদের জন্য কোয়ান্টাম তত্ত্ব আর বৃহৎ ভর যেমন গ্রহ, নক্ষত্র ও ছায়াপথের জন্য আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। অর্থাৎ এই মহাবিশ্বের আচরণ বুঝতে কাজে লাগে যে তত্ত্ব, তা হলো আপেক্ষিকতা। অন্যদিকে পরমাণুর বিক্রিয়া ব্যাখ্যা করে যে তত্ত্ব, তার নাম কোয়ান্টাম তত্ত্ব। দু’টি তত্ত্বই, বলা বাহুল্য, বেশ বিচিত্র। যেমন আপেক্ষিকতা অনুযায়ী কোনো বস্তুর ভর বাড়ে বা কমে তার গতিবেগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে। তেমনি কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুযায়ী কোনো একটা কণা যন্ত্রে ধরা পড়ার আগে অনেক কণা হিসেবে থাকে। অথচ যন্ত্র যখন তাকে শনাক্ত করে ফেলে তখন তা ফের একটা হয়ে যায়। এ রকম ভূতুড়ে ব্যাপারের জন্যই হয়তো আইনস্টাইন মানতে চাইতেন না কোয়ান্টাম তত্ত্বের কিছু কিছু ব্যাখ্যা। যদিও তিনি ১৯২১ সালে আলোর ফটোইলেকট্রিক এফেক্ট-এর ব্যাখ্যার জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। মহাবিশ্বে এ রকম দু’টি নিয়ম কেন? সবকিছুর জন্য একটাই নিয়ম চালু নয় কেন? তাহলে ওই দু’টি তত্ত্ব কি একমাত্র কোনো তত্ত্বের দু’রকম চেহারা? তা যদি হয় তবে সেই সার্বিক তত্ত্ব, আপেক্ষিকতা আর কোয়ান্টাম তত্ত্বের মিলনে যার জন্ম, তা মিলবে কী করে? বলা বাহুল্য, একটি সার্বিক ঐক্যবদ্ধ তত্ত্ব আবিষ্কারের চেষ্টা বিজ্ঞানীরা করে যাচ্ছেন অনেককাল। সফল হননি কেউই এখনও পর্যন্ত। আইনস্টাইনের অন্তিম ইচ্ছা ছিল একটি একীভূত ক্ষেত্র তত্ত্ব কিন্তু তাঁর এ-ইচ্ছা পূরণ হয়নি।

 

আজ থেকে প্রায় তেরশত সত্তর কোটি বছর আগে অতিউত্তপ্ত ও অতিঘণ এক শক্তিপুঞ্জে প্রচ- বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে মহাবিশ্বের উৎপত্তি হয়েছিল বলে মনে করা হয়। একে বলা হয় মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব। মহাবিশ্বের জন্ম ব্যাখ্যায় বহুকাল আগে থেকেই গৃহীত হয়েছে এই তত্ত্ব। যারপর থেকে ওই বিস্ফোরণের ধাক্কায় ক্রমাগত ফুলেফেঁপে বড় হচ্ছে মহাবিশ্ব। অর্থাৎ শুরুতে পুঞ্জিভুত শক্তিপুঞ্জে বিস্ফোরণের ফলে তা একটি স্ফীতিশীল বেলুনের